চলতি বছর দেশের ব্যবসায়ীরা মোট ৭ লাখ ৫৫ হাজার টন পুরনো বা স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করেছেন, যা এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬ সালে রেকর্ড ৩৪ লাখ ৫ হাজার ৬৮ টন আমদানি হয়েছিল। এ হিসেবে দশ বছরের ব্যবধানে আমদানি কমেছে প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ টন বা ৭৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
হংকং কনভেনশন অনুয়ায়ী, শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডগুলো গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তর না করলে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করতে পারবে না। আর এ আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকেই বড় ধরনের সংকটে পড়েছে দেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প খাত। এরই মধ্যে ইয়ার্ড আধুনিকায়ন করতে না পেরে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন অনেকে। অন্যদিকে ইয়ার্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে শ্রমিকদের বড় একটি অংশ।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সর্বশেষ ১০ বছরের তথ্যমতে, ২০১৬ সালে ২৫২টি স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করা হয়। যার সম্মিলিত ওজন ছিল ৩৪ লাখ ৫ হাজার ৬৮ টন। ২০১৭ সালে আনা হয় ২০৪টি জাহাজ, সম্মিলিত ওজন ছিল ২১ লাখ ২৮ হাজার ৭৬৩ টন।
২০১৮ সালে ২৫ লাখ ৪০ হাজার ১৭৮ টন বা ২১৫টি জাহাজ, ২০১৯ সালে ২৩ লাখ ৬০ হাজার ৭১৪ টন বা ২০৬টি জাহাজ, ২০২০ সালে ২০ লাখ ৩৯ হাজার ৬৬৬ টন বা ১২৮টি জাহাজ, ২০২১ সালে ২৭ লাখ ২৮ হাজার ৫৯৭ টন বা ২৮০টি জাহাজ, ২০২২ সালে ১১ লাখ ৪৫ হাজার ৩২৪ টন বা ১৫০টি জাহাজ, ২০২৩ সালে ১০ লাখ ২২ হাজার ১১০ টন বা ১৭৩টি জাহাজ এবং ২০২৪ সালে ৯ লাখ ৬৮ হাজার ২২ টন বা ১৪৪টি জাহাজ আমদানি করা হয়।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক দশকের মধ্যে চলতি বছর স্ক্র্যাপ জাহাজের আমদানি ছিল সর্বনিম্ন, যা ১০০-এর নিচে। মূলত কভিড-১৯ মহামারীর পর থেকেই এ খাত ক্রমেই তলানির দিকে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে আমদানি হয়েছিল ৫৫টি জাহাজ, যার মোট ওজন ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৯৩৩ টন। অন্যদিকে হংকং কনভেনশন অনুযায়ী, গ্রিন ইয়ার্ড চালুর পর চলতি বছরের শেষ ছয় মাসে আমদানি হয়েছে মাত্র ৩৮টি জাহাজ, যার সম্মিলিত ওজন ৩ লাখ ২৫ হাজার ৩৯ টন। অর্থাৎ গ্রিন ইয়ার্ড বাধ্যতামূলক হওয়ার পর জাহাজ আমদানি আশঙ্কাজনক হারে কমেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কভিড সংক্রমণের কারণে বিশ্ববাজারে মন্দা দেখা দেয়ায় জাহাজ ভাঙা শিল্পের পতন শুরু হয়। পাশাপাশি দেশে বড় অংকের এলসি বন্ধ হয়ে যাওয়া ও অভ্যন্তরীণ ডলার সংকট আমদানিতে বড় ধাক্কা দেয়। ব্যাংক ঋণ ও সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় জাহাজ আমদানি কমতে শুরু করলে অনেক ব্যবসায়ী ইয়ার্ড বন্ধ করে দেন। ২০২০ সালের পর থেকে অনেকে ইয়ার্ড বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও এখন হংকং কনভেনশন কার্যকর হওয়ায় কেবল গ্রিন ইয়ার্ডের মালিকরাই আমদানি করতে পারছেন, ফলে স্ক্র্যাপ জাহাজের সংকট আরো বেড়েছে।
বিএসবিআরএ ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ১৭টি ইয়ার্ড গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তরের কাজ সম্পন্ন করেছে। আরো ছয়টি তালিকাভুক্তির শেষ ধাপে রয়েছে। উল্লেখযোগ্য গ্রিন ইয়ার্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে পিএইচপি শিপ ব্রেকিং, এসএস করপোরেশন ইউনিট ১, ২ ও ৩, কবির স্টিল, কে আর শিপ রিসাইক্লিং, আরব শিপ ব্রেকিং, ম্যাক করপোরেশন, জনতা স্টিল, তাহের অ্যান্ড কোং, এনবি স্টিল অন্যতম। এছাড়া নতুন যুক্ত হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে কিং স্টিল, মাদার স্টিল, মাস্টার অক্সিজেন, বারাকা শিপ রিসাইক্লিং, সাগরিকা শিপব্রেকিং ও বব শিপ রিসাইক্লিং।
বিএসবিআরএর সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, ১১৬টি শিপইয়ার্ডের তালিকা থাকলেও প্রাথমিক অনুমোদন রয়েছে ১০৫টির। এর মধ্যে ২৩টি ইয়ার্ড গ্রিন ইয়ার্ডে অন্তর্ভুক্ত হলেও বাজেট সংকটে অধিকাংশই আধুনিকায়নের কাজ শুরু করতে পারেনি। এক যুগ আগে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বরাদ্দকৃত নয়টি মৌজায় ১৮৫টি শিপ ইয়ার্ড নিবন্ধিত ছিল।
বিএসবিআরএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ২০২২ সালে হংকং কনভেনশনে স্বাক্ষর করে, যা গত ২৫ জুন থেকে কার্যকর হয়েছে। এ কনভেনশনের শর্ত পূরণ না করলে ব্যবসায়ীরা কোনো জাহাজ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে আনতে পারবেন না। ফলে গ্রিন শিপ ইয়ার্ড ছাড়া এ শিল্পে ব্যবসা পরিচালনার আর কোনো সুযোগ নেই, যা এ খাতের জন্য সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবতা। যেখানে আগে জাহাজ এনে ইয়ার্ড চালানো যেত, এখন ইয়ার্ড প্রস্তুত না থাকলে জাহাজই আসবে না।
তিনি আরো বলেন, ‘একটি ইয়ার্ডকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে (গ্রিন ইয়ার্ড) ৫০-১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা উদ্যোক্তাদের জন্য বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে। কারণ ব্যাংকগুলো জাহাজ আমদানিতে ঋণ দেয় কিন্তু ইয়ার্ড আধুনিকায়নে আগ্রহী নয়। যেটা প্রচলিত ব্যাংকিং কাঠামোর সঙ্গে সংঘাত তৈরি করেছে।’
বিএসবিআরএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বলেন, ‘সংকট মোকাবেলায় ইয়ার্ড উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি বিশেষ ঋণের উদ্যোগ নেয়া খুবই জরুরি। গভর্নরের কাছে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তিনি আগামী বছরের শুরুতে আলোচনায় বসে সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।’
মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন চৌধুরী জানান, বর্তমানে দেশে ২৩টি গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড রয়েছে। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সহযোগিতা দিলে সেটা ৬০-৭০টিতে উন্নীত করা সম্ভব। হংকং কনভেনশন অনুযায়ী ইয়ার্ড প্রস্তুত হলে পরিবেশগত ছাড়পত্রও একই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হবে। ফলে পরিবেশ সুরক্ষা আরো শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি চট্টগ্রামে শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের নতুন কার্যালয় চালু হওয়ায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা আরো বাড়বে।